একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়ার নিয়ম
একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়া এখন সবার জন্যই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।দিনের বড় একটা সময় স্ক্রিনে কাটালে চোখ জ্বালা, শুকনো ভাব আর মাথাব্যথা খুব সাধারণ সমস্যা।
এই লেখায় ২০-২০-২০ নিয়ম, পলক ফেলা, সঠিক আলো ও বসার ভঙ্গি নিয়ে সহজ ভাষায় কথা বলেছি।খাবার, ঘুম আর blue-লাইট চশমা নিয়ে সঠিক তথ্যও পাবেন।পড়া শেষে আপনার চোখের যত্নের একটা কার্যকর রুটিন নিজেই সাজিয়ে নিতে পারবেন।
পোস্ট সূচিপত্রঃএকটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়ার নিয়ম।
- ১.একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্নঃ কেন এটা এখন আর অবহেলা করার বিষয় নয়
- .২.ডিজিটাল আই স্ট্রেইন আসলে কী, আর কেন হয়
- ৩.আপনার চোখ কি সংকেত দিচ্ছে? লক্ষণগুলো চিনে নিন
- ৪.২০-২০-২০ নিয়মঃ সবচেয়ে সহজ অথচ সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস
- ৫.পলক ফেলার গুরুত্বঃ শুকনো চোখের আসল সমাধান
- ৬.মনিটরের দূরত্ব, উচ্চতা ও বসার সঠিক ভঙ্গি
- ৭.আলো, ব্রাইটনেস আর গ্লেয়ারঃ ঘরের পরিবেশ ঠিক করুন
- ৮.Blue লাইট চশমা কি সত্যিই কাজে দেয়?
- ৯.চোখের ছোট ছোট ব্যায়াম যা কাজের ফাঁকেই করা যায়
- ১০.খাবার, পানি আর ঘুমঃ ভেতর থেকে চোখের যত্ন
- ১১.কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
- ১২.শেষ কথা বা লেখকের মন্তব্যঃ একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়ার নিয়ম
১. একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্নঃ কেন এটা এখন আর অবহেলা করার বিষয় নয়
একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নিয়ে লিখতে বসে আমার নিজের একটা পুরোনো অভ্যাসের কথা মনে পড়ে গেল। এক সময় টানা ছয়-সাত ঘণ্টা স্ক্রিনে চোখ রেখে কাজ করতাম, মাঝখানে একবারও উঠতাম না। সন্ধ্যায় চোখ জ্বালা করত, মাথা ভারী লাগত, আর নিজেকে বোঝাতাম, "আজ একটু বেশি খাটুনি গেছে।"
পরে বুঝলাম, ব্যাপারটা শুধু খাটুনির নয়। আমাদের চোখ এমনভাবে তৈরিই হয়নি যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাছের একটা উজ্জ্বল পর্দার দিকে স্থির তাকিয়ে থাকবে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, নিয়মিত কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের বড় একটা অংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ, কোথাও ৯০ শতাংশ পর্যন্ত, কোনো না কোনো সময় চোখের ক্লান্তিতে ভোগেন। মানে আপনি একা নন।
তাই আজকের লেখাটা একেবারে চায়ের কাপ হাতে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করার মতো। কোনো ভারী পরিভাষা নয়, শুধু কিছু সহজ আর কাজের নিয়ম, যেগুলো আমি নিজে মেনে উপকার পেয়েছি এবং যেগুলোর পেছনে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমর্থন আছে। শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকুন, আশা করি খালি হাতে ফিরবেন না।
২. ডিজিটাল আই স্ট্রেইন আসলে কী, আর কেন হয়
দীর্ঘ সময় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, চিকিৎসার ভাষায় তাকে বলে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম। নামটা শুনতে গম্ভীর হলেও এটা সাধারণ একটা সমস্যা, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভ্যাস বদলালে ঠিক হয়ে যায়।
কারণটা বুঝতে হলে একটু ভেতরে তাকাতে হবে। কাগজের লেখা স্পষ্ট আর ধারালো, কিন্তু স্ক্রিনের লেখা তৈরি হয় ক্ষুদ্র পিক্সেল দিয়ে, যার কিনারা কিছুটা অস্পষ্ট। ফলে চোখের ভেতরের পেশিকে বারবার ফোকাস ঠিক করতে হয়। সেই পেশি দিনভর টানটান থাকলে ক্লান্ত হবেই, ঠিক যেমন সারাদিন ভারী ব্যাগ বইলে কাঁধ ব্যথা করে।
এর সঙ্গে যোগ হয় আরও কিছু কারণ, যেমন স্ক্রিনের ঝলক, ভুল আলো, খুব কাছ থেকে কাজ করা আর সবচেয়ে বড় কথা, পলক কম ফেলা। এগুলো একসঙ্গে চোখের ওপর চাপ বাড়ায়। তাই সমাধানও একটা জাদুকরি কৌশল নয়, বরং কয়েকটা ছোট ছোট অভ্যাসের সম্মিলিত ফল। একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখ ভালো রাখার উপায় খুঁজতে গেলে এই কথাটাই সবার আগে মাথায় রাখা দরকার।
৩. আপনার চোখ কি সংকেত দিচ্ছে? লক্ষণগুলো চিনে নিন
চোখ কিন্তু চুপচাপ কষ্ট সহ্য করে না, সে আগে থেকেই ছোট ছোট সংকেত দেয়। সমস্যা হলো, আমরা কাজে এতটাই ডুবে থাকি যে সেগুলো খেয়ালই করি না। বিকেল হতে না হতেই চোখ ভার হয়ে আসছে, লেখাগুলো একটু ঝাপসা লাগছে, এমনটা হলে সেটা কিন্তু শরীরের সোজাসুজি বার্তা, আর তখনই স্ক্রিন টাইম কমানোর প্র্যাকটিক্যাল উপায় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
সাধারণ লক্ষণগুলো একবার দেখে নিনঃ
- চোখ জ্বালা করা, চুলকানো বা লাল হয়ে যাওয়া
- চোখ শুকনো লাগা কিংবা বালু পড়ার মতো অনুভূতি
- লেখা ঝাপসা বা দুটো করে দেখা
- কপাল বা চোখের পেছনে মাথাব্যথা
- আলোর দিকে তাকাতে অস্বস্তি
- ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে ব্যথা
একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়ার প্রথম ধাপই হলো এই লক্ষণগুলো সময়মতো চিনে নেওয়া। এর মধ্যে দুটো-তিনটে লক্ষণ প্রায়ই টের পেলে বুঝে নিন, আপনার চোখের এখন একটু মনোযোগ দরকার। ঘাড়-কাঁধের ব্যথাও কিন্তু চোখের সমস্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, কারণ স্ক্রিন স্পষ্ট দেখতে গিয়ে আমরা অজান্তেই ঘাড় সামনে ঝুঁকিয়ে ফেলি।
৪. ২০-২০-২০ নিয়ম: সবচেয়ে সহজ অথচ সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস
চোখের যত্নের কথা উঠলে আমি সবার আগে এই নিয়মটার কথাই বলি। নিয়মটা এত সহজ যে অনেকে বিশ্বাসই করতে চান না যে এটা কাজ করে। প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট, অর্থাৎ প্রায় ৬ মিটার দূরের কোনো জিনিসের দিকে তাকান। আমেরিকান একাডেমি অফ অফথালমোলজিসহ অনেক চক্ষু বিশেষজ্ঞ সংস্থা এই নিয়মের কথা বলে থাকেন।
কেন কাজ করে? কাছের জিনিস দেখার সময় চোখের ফোকাসিং পেশি সংকুচিত হয়ে থাকে। দূরে তাকালে সেই পেশি শিথিল হওয়ার সুযোগ পায়। জানালার বাইরে গাছের ডাল, আকাশ কিংবা ঘরের অন্য প্রান্তের দেয়াল, যেকোনো কিছুর দিকেই তাকাতে পারেন। মূল কথা, চোখকে কাছের ফোকাস থেকে একটু ছুটি দেওয়া। চোখের ক্লান্তি দূর করার উপায় হিসেবে তাই এটাই সবচেয়ে সহজ আর সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
আমি ফোনে প্রতি ২০ মিনিটে একটা নীরব অ্যালার্ম দিয়ে রাখি। প্রথম কয়েকদিন বিরক্ত লাগে, কারণ কাজের গতি ভেঙে যায়। কিন্তু এক সপ্তাহ পর দেখবেন, দিনশেষে চোখের ভার অনেক কমে গেছে। সত্যি বলতে, একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়ার যেকোনো তালিকায় এই ২০ সেকেন্ডের বিরতিই সবার আগে থাকা উচিত।
৫. পলক ফেলার গুরুত্বঃ শুকনো চোখের আসল সমাধান
একটা মজার তথ্য দিই। স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা মিনিটে গড়ে ১৫ থেকে ২০ বার পলক ফেলি। কিন্তু স্ক্রিনে মনোযোগ দিলে সেই সংখ্যা অনেক কমে যায়, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে তা ৫ থেকে ৭ বার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। আমরা টেরও পাই না, অথচ চোখ ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যেতে থাকে।
পলক ফেললে চোখের ওপর অশ্রুর একটা পাতলা স্তর ছড়িয়ে পড়ে, যা চোখকে ভেজা, পরিষ্কার ও আরামদায়ক রাখে। পলক কমে গেলে সেই স্তর তাড়াতাড়ি উবে যায়, আর তখনই জ্বালা, খচখচ ভাব আর ঝাপসা দেখা শুরু হয়। বিশেষ করে এসি ঘরে কাজ করলে এই সমস্যা আরও বাড়ে।
তাই কাজের ফাঁকে ইচ্ছা করে পলক ফেলার অভ্যাস করুন। সম্পূর্ণ পলক, মানে চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ করে ধীরে খোলা। চোখের শুষ্কতা দূর করার রিফ্রেশিং ড্রপ দরকার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রিজারভেটিভ-মুক্ত আর্টিফিশিয়াল টিয়ার ড্রপ বেছে নিতে পারেন। তবে নিজে নিজে যে কোনো ড্রপ কিনে ব্যবহার না করাই ভালো। একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখ ভালো রাখার উপায়গুলোর মধ্যে পলক ফেলাটাই সবচেয়ে সস্তা, অথচ সবচেয়ে কম মানা হয়।
৬. মনিটরের দূরত্ব, উচ্চতা ও বসার সঠিক ভঙ্গি
অনেকেই কাজের চাপে মনিটর একদম চোখের কাছে টেনে নেন, কিংবা ল্যাপটপ কোলে নিয়ে ঘাড় নুইয়ে বসেন। এতে চোখ আর ঘাড়, দুটোরই ক্ষতি হয়। সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্ক্রিন চোখ থেকে প্রায় এক হাত বা তার একটু বেশি, অর্থাৎ ৫০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার দূরে রাখা ভালো।
উচ্চতার দিকেও খেয়াল রাখুন। স্ক্রিনের উপরের কিনারা চোখের সমান্তরালে বা সামান্য নিচে থাকলে আপনি হালকা নিচের দিকে তাকিয়ে কাজ করবেন। এতে চোখের খোলা অংশ কম থাকে বলে পানি কম উবে যায়। এর সঙ্গে পিঠ সোজা রাখুন, পা মাটিতে রাখুন, আর কাঁধ শিথিল রাখুন।
ল্যাপটপে কাজ করলে একটা সস্তা ল্যাপটপ স্ট্যান্ড আর আলাদা কিবোর্ড-মাউসই আপনার জীবন বদলে দিতে পারে। স্ট্যান্ডে স্ক্রিন চোখের উচ্চতায় উঠে আসে, আর কিবোর্ড আলাদা থাকলে হাত আরামে কাজ করে। ছোট একটা বিনিয়োগ, কিন্তু চোখ আর ঘাড়ের জন্য অনেক বড় স্বস্তি। একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখ ভালো রাখার উপায় হিসেবে বসার ভঙ্গি ঠিক করাটা তাই মোটেই ছোট বিষয় নয়।
৭. আলো, ব্রাইটনেস আর গ্লেয়ারঃ ঘরের পরিবেশ ঠিক করুন
অন্ধকার ঘরে ঝকঝকে উজ্জ্বল স্ক্রিন, কিংবা খুব আলোকিত ঘরে ম্লান স্ক্রিন, দুটোই চোখের জন্য কষ্টকর। সবচেয়ে ভালো নিয়ম হলো, স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা আশপাশের আলোর কাছাকাছি রাখা। একটা সহজ পরীক্ষা করে দেখুন। স্ক্রিনের সাদা অংশটা যদি ঘরের আলোর চেয়ে আলাদা করে "জ্বলজ্বল" করে, তাহলে ব্রাইটনেস কমান।
গ্লেয়ার বা প্রতিফলিত ঝলকও চোখের বড় শত্রু। জানালা বা বাতির আলো যদি সরাসরি স্ক্রিনে পড়ে, চোখকে ওই ঝলকের সঙ্গে লড়াই করে লেখা পড়তে হয়। স্ক্রিন এমনভাবে রাখুন যাতে জানালা আপনার পাশে থাকে, সামনে বা পেছনে নয়। দরকার হলে পর্দা টেনে দিন।
রাতে কাজ করলে নাইট মোড বা ওয়ার্ম কালার ফিল্টার চালু রাখুন। এতে স্ক্রিনের আলো নরম হয়, চোখের আরাম বাড়ে। ডার্ক মোড ব্যবহার করলে চোখের উপকারিতা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়, তবে বাস্তবে এটা মূলত কম আলোর ঘরে ঝলক কমিয়ে আরাম দেয়, উজ্জ্বল আলোর দিনে সবার জন্য এটা সমান কার্যকর নাও হতে পারে। আর টেক্সটের সাইজ এমন রাখুন যাতে চোখ কুঁচকে পড়তে না হয়। প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় জুম করুন, এতে লজ্জার কিছু নেই। মনে রাখবেন, একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন শুধু চোখের ব্যায়ামে সীমাবদ্ধ নয়, ঘরের আলো আর পরিবেশও এর বড় একটা অংশ।
৮. Blue লাইট চশমা কি সত্যিই কাজে দেয়?
আজকাল প্রায় সবাই জিজ্ঞেস করেন, "ভাই, ব্লু লাইট কাট চশমা নেব?" বিজ্ঞাপনে তো দারুণ সব দাবি দেখা যায়। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আপাতত খুব জোরালো নয়। আমেরিকান একাডেমি অফ অফথালমোলজি স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য এই চশমা আলাদা করে সুপারিশ করে না, আর কয়েকটি রিভিউতেও চোখের ক্লান্তি কমাতে এর স্পষ্ট সুবিধা পাওয়া যায়নি।
তার মানে এই নয় যে এটা ক্ষতিকর। ব্লু লাইট প্রোটেক্ট গ্লাস ব্যবহারের সুবিধা নিয়ে যত দাবিই শোনা যাক, এর বেশিরভাগই ব্যক্তিগত আরামের অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর নয়। তাই কারও যদি পরে আরাম লাগে, ব্যবহার করতে সমস্যা নেই। কিন্তু শুধু এই চশমার ওপর ভরসা করে ২০-২০-২০ নিয়ম, ঠিক আলো আর নিয়মিত বিরতির মতো প্রমাণিত অভ্যাসগুলো বাদ দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
তবে একটা বিষয়ে সচেতন থাকা ভালো। রাতে ঘুমানোর ঠিক আগ পর্যন্ত উজ্জ্বল স্ক্রিন দেখলে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই শোয়ার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করার চেষ্টা করুন। এটা চশমার চেয়েও বেশি কাজে দেবে। আসলে চোখের ক্লান্তি দূর করার সহজ উপায় অনেক সময় দামি কোনো গ্যাজেটে নয়, বরং ঘুমের আগের এই ছোট্ট অভ্যাসেই লুকিয়ে থাকে।
৯. চোখের ছোট ছোট ব্যায়াম যা কাজের ফাঁকেই করা যায়
আমরা শরীরের জন্য ব্যায়াম করি, কিন্তু চোখের জন্য কেউ ভাবি না। অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় তাকিয়ে থাকা চোখের জন্যও দরকার সামান্য নড়াচড়া। ভালো খবর হলো, এই ব্যায়ামগুলো করতে আলাদা সময় লাগে না, কাজের ফাঁকে দুই-এক মিনিটেই হয়ে যায়। ফ্রিল্যান্সারদের চোখের ব্যায়াম ও ২০-২০-২০ রুল আলাদা করে গুরুত্ব দিয়ে মানা দরকার, কারণ নিজের কাজের সময় নিজেকেই ঠিক করতে হয়, আর বিরতি নেওয়ার কথা অনেক সময় মনেই থাকে না।
আমার প্রিয় কয়েকটা অভ্যাসঃ
- পামিংঃ দুই হাতের তালু ঘষে গরম করে বন্ধ চোখের ওপর আলতো করে রাখুন, চাপ দেবেন না। ৩০ সেকেন্ড এভাবে থাকুন।
- চোখ ঘোরানোঃ মাথা স্থির রেখে চোখ ধীরে ডানে, বামে, ওপরে ও নিচে ঘোরান।
- ফোকাস বদলঃ একটা আঙুল নাকের সামনে ধরে সেদিকে তাকান, তারপর দূরের কোনো জিনিসে ফোকাস করুন। কয়েকবার করুন।
এই ব্যায়ামগুলোর সঙ্গে ঘাড় আর কাঁধ ঘোরানোও জুড়ে নিন। কাজের ফাঁকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, একটু হাঁটুন, জানালার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকান। এই ছোট বিরতিগুলো শরীর আর মন, দুটোকেই তাজা করে দেয়, আর তখন কাজের মানও নিজে থেকেই ভালো হয়। একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখ ভালো রাখার উপায় নিয়ে কথা বলতে গেলে এই ছোট ব্যায়ামগুলোকে কিছুতেই বাদ দেওয়া যায় না।
১০. খাবার, পানি আর ঘুমঃ ভেতর থেকে চোখের যত্ন
একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন শুধু স্ক্রিনের সামনে বসেই হয় না, এর অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের ওপর। পর্যাপ্ত পানি না খেলে শরীরের সঙ্গে চোখও শুকিয়ে যেতে পারে। তাই কাজের টেবিলে সবসময় এক বোতল পানি রাখুন, আর তৃষ্ণা পাওয়ার আগেই একটু একটু করে খান।
খাবারের দিকেও একটু নজর দিন। চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী কিছু খাবারঃ
- গাজর, মিষ্টি কুমড়া ও পালং শাক, যেগুলোতে ভিটামিন এ ও লুটিন থাকে
- ডিম ও কলিজা, যা ভিটামিন এ-এর ভালো উৎস
- মাছ, বিশেষ করে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ
- কমলা, লেবু ও পেয়ারার মতো ভিটামিন সি-যুক্ত ফল
আর ঘুম? এটাকে অনেকে বিলাসিতা ভাবেন, অথচ ঘুমের সময়ই চোখ ও শরীর নিজেকে মেরামত করে নেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম সুপারিশ করা হয়। আর একটা ছোট্ট অনুরোধ, চোখ কচলাবেন না, বিশেষ করে ধোয়া হয়নি এমন হাতে তো নয়ই। চোখের ক্লান্তি দূর করার উপায় হিসেবে পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।
১১. কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন
ঘরোয়া নিয়ম মেনে চললে অধিকাংশ সময় চোখের ক্লান্তি অনেক কমে যায়। কিন্তু সব সমস্যা ঘরে বসে সামলানো যায় না। বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি চোখের ব্যথা বা ঝাপসা দেখা দিনের পর দিন থেকে যায়, তাহলে দেরি না করে চক্ষু চিকিৎসকের কাছে যান।
কিছু লক্ষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ, এগুলো দেখা দিলে একদম অপেক্ষা করবেন নাঃ
- হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
- চোখের সামনে কালো দাগ বা ঝলকানি দেখা
- চোখ টানা লাল থাকা বা অবিরাম পানি পড়া
- ঘন ঘন তীব্র মাথাব্যথা
আরেকটা কথা মনে রাখবেন। কোনো সমস্যা না থাকলেও বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করানো ভালো অভ্যাস। অনেক সময় সামান্য পাওয়ারের ত্রুটি বা শুকনো চোখের রোগ আমরা টেরই পাই না, অথচ সেগুলোই স্ক্রিনের কাজ কষ্টকর করে তোলে। আপনি চশমা পরলে পাওয়ার ঠিক আছে কি না, সেটাও এই সুযোগে যাচাই করে নিন। একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখ ভালো রাখার উপায়গুলো মেনেও সমস্যা থেকে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা।
১২. শেষ কথা বা লেখকের মন্তব্যঃ একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়ার নিয়ম
এতক্ষণ গল্প করে মনে হচ্ছে যেন পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিলাম। এই লেখার একটাই উদ্দেশ্য, আপনি যেন আজ থেকেই নিজের চোখের প্রতি একটু সদয় হন। একটানা কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের যত্ন নেওয়া কোনো বিরাট আয়োজনের ব্যাপার নয়। ২০-২০-২০ নিয়ম, ঘন ঘন পলক, ঠিক আলো আর সঠিক বসার ভঙ্গি, এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই আসল কাজ করে।
সবকিছু একসঙ্গে শুরু করার দরকার নেই। আজ শুধু একটা অ্যালার্ম সেট করুন, কাল ব্রাইটনেসটা ঠিক করুন, পরশু স্ক্রিনের উচ্চতা বদলান। এভাবে ধীরে ধীরে অভ্যাসগুলো জীবনের অংশ হয়ে যাবে। মনে রাখবেন, চোখ আপনার সবচেয়ে দামি সম্পদগুলোর একটা, আর তাকে সময়মতো যত্ন না করলে পরে আফসোস করতে হয়।
আপনার কোন অভ্যাসটা সবচেয়ে কাজে লেগেছে, কিংবা চোখের যত্ন নিয়ে আপনার নিজের কোনো টিপস আছে কি না, কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। আপনার অভিজ্ঞতাটা আরও অনেকের কাজে লাগতে পারে। ভালো থাকবেন, আর চোখকে একটু বিশ্রাম দিতে ভুলবেন না।



ফোকাস ওয়ার্ল্ড ২৪-এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url